ক্রিকেটের সেফটি গিয়ারের উন্নতির সময়

নব্বইয়ের দশক। ক্রিকেটের সেফটি গিয়ারের উন্নতির সময়। তবুও ব্যাটসম্যানরা শান্তিতে ছিলেন না। আপনিও থাকতেন না। যদি আপনি তখনকার ওপেনার হতেন, তাহলে তো আর কথাই নেই। ‘টু ডাব্লিউ’- ওয়াকার-ওয়াসিম আপনার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি উড়িয়ে দিবে রেড চেরি দিয়ে।অ্যামব্রোস-ওয়ালশের টার্গেট আপনার মাথা।

অবজ্ঞা আর অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে ডোনাল্ড আপনার আত্মায় ক্ষত সৃষ্টি করবে। পোলক-ম্যাকগ্রা; যাদের দেখে অমন কিছুই মনে হয় না। কিন্তু তারা আপনার উইকেটটা নিয়েই থামবে।

দারুণ ব্যাপার হচ্ছে মাইকেল আথারটন ১৯৮৯ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ১১৫টি টেস্ট খেলেছেন। বলা ভালো সারভাইব করেছেন। কারণ গোটা টেস্ট ক্যারিয়ারেই প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছেন প্রথম অনুচ্ছেদে বর্ণিত বোলারদের। এর চেয়ে দারুণ হচ্ছে এই ছবিটা।

এটা আথারটনের ছবি। তুলেছেন ডেভিড অ্যাশডাউ্ন। ১৯৯৪ সালে জ্যামাইকা টেস্টে ভয়ংকর কোর্টনি ওয়ালশের বাউন্সারকে ডজ করছেন আথারটন। শরীরকে বাতাসে ঝুলিয়ে, বলের লাইন থেকে সরিয়ে এনে, একদম মিলি সেকেন্ডের কড়া হিসেবে।

আথারটনের ক্যারিয়ারজুড়ে এমন অসংখ্য ছবি আছে। যা দেখে বোলারদের আরো ভয়ংকর মনে হতো। কিন্তু আথারটনের এটা করতেই হতো, অপশন ছিল সীমিত, রাস্তা ছিল সীমিত। কারণটাও বেশ পরিষ্কার। ডাক করতে পারতেন না তিনি।

ক্যারিয়ারজুড়েই টানা ব্যাকপেইনের সাথে যুদ্ধ করে গেছেন। ব্যাথা বাড়ছিল, পিঠের অবনতি হচ্ছিল। ফলাফল, অ্যাঙ্কিলোজিং স্পন্ডিলাইটস। বংশগত জটিল এই রোগের জন্য ক্যারিয়ারের শুরুতেই শেষের ঘন্টা শুনতে পাচ্ছিলেন। তার ফুটবলার বাবা অ্যালান আথারটনের ক্যারিয়ারও থেমে গেছিল একই কারণে।

নিজের এই অবস্থা কাউকে জানাচ্ছিলেনও না আথারটন। দুর্গতি আরো বাড়লো ১৯৯২ সালে। মেরুদণ্ডের ডিস্ক স্লিপ করলো। চতুর্থ ও পঞ্চম কশেরুকায় ছুরিকাঁচি চালানোর জন্য তাকে যেতে হলো অপারেশন টেবিলে।

ব্যাথাকে সহ্যসীমায় রাখতে পেইনকিলারের ডায়েট চার্ট বানাতে হয়েছে আথারটনের। সাথে নিতেন কর্টিসোন ইঞ্জেকশন, যার কারণে বিশাল একটা স্বাস্থ্য ঝুঁকিও ছিল তার। সব ঠিকঠাক মতো করার পরও পাগলাটে দেখাত তাকে। দক্ষিন আফ্রিকায় বরফ গলা পানিতে সাঁতারও কেটেছেন। তবে সব কিছু ছাপিয়ে একটা ছবিই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ক্রিকেট খেলার জন্য আথারটনের ডেস্পারেশন।

ইয়ান বোথাম একবার লেখেছিলেন, ‘সাহসী, একগুঁয়ে, জেদী, বীর। কথায় বলে একজন ক্রিকেটারের ব্যাটিংই সাক্ষ্য দেয় মানুষ হিসেবে সে কেমন। এমন কয়জন ব্যাটসম্যান আছে, যাদের ব্যাটিং দেখে একদম স্বচ্ছ একটা চিত্র পাওয়া যাবে।’

ভক্তরা ক্রিকেটের পরিধিকে প্রায়ই ছোট করে আনেন। সাফল্যকে মাপেন পরিসংখ্যান দিয়ে। তারা ভুলে যান এই প্রসেসটা কম্পিউটার সিমুলেশন নয়, কিন্তু একটা গেম। যেখানে রক্ত মাংসের খেলোয়াড়রা খেলেন। যেখানে কেবল দৃশ্যমান প্রতিপক্ষই নয়, থাকে অদৃশ্য প্রতিপক্ষও। যেমনটা ক্যারিয়ারজুড়েই ফেস করে গেছেন আথারটন। চ্যাম্পিয়নের মতো এই অদৃশ্য প্রতিপক্ষ, চ্যালেঞ্জকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন।

*আমার কথা

পরিসংখ্যান নিয়ে সবচেয়ে দারুণ উক্তিটা করে গেছেন গুরু নেভিল কার্ডাস। যার ম্যাচ রিপোর্ট, আর্টিকেল পড়ার জন্য ক্রিকেটাররাও বসে থাকতেন, ‘পরিসংখ্যান একটা আস্ত গাধা’

তবুও ক্রিকেটে এর চাহিদা, প্রভাব, কদর কম নয়। পরিসংখ্যানই কি শেষ কথা? আমার কাছে না। পরিসংখ্যান, সংখ্যা এসব কখনো বলবে না নান্নু ভাই কতটা দারুণ ব্যাটসম্যান ছিলেন। পাকিস্তানের মোহাম্মদ আসিফ; সাপের মতো সুইং করাত বল, যেদিকে খুশি। পরিসংখ্যান দেখাবে না সেই সাপের ছোবল। আফতাব আহমেদের এটাকিং মুডের ফুল গিয়ারের হাওয়াও লাগবে না গায়ে। রেকর্ডবুকে লেখা থাকবে না সাকিবের ভাঙা আঙ্গুল নিয়ে নিদাহাসে ছুটে যাওয়া, দেখাবে না মাশরাফির ইঞ্জুরি নিয়ে ছোটার দৃশ্য। আথারটনের যুদ্ধটাও তো লেখা নেই।

ক্রিকেট; আশা, নিরাশা, মায়া, নির্দয় খেলা। হৃদয়ের খেলা, হৃদয়হীনতার খেলা।